ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম, জালভোট, পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এবং কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এসব অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে দলটি। একই সঙ্গে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে তারা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন জানান, শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনী আচরণবিধির প্রতি সম্মান জানিয়ে শুক্রবারের পরিবর্তে কর্মসূচি এক দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাত পৌনে ১০টার দিকে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। ঘোষিত ফলে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট।
ভোটের দিন রাত ৯টার দিকে ঠাকুরগাঁও শহরের জামায়াত কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন দেলাওয়ার হোসেন। এ সময় তিনি নির্বাচনী প্রচার থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন।
দেলাওয়ার হোসেনের দাবি, নির্বাচনের শুরু থেকেই অনিয়মের আশঙ্কা ছিল তাঁদের। প্রচারের সময় বিএনপির প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকেরা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। ভোটের আগে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়। ধানের শীষে ভোট না দিলে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে না এবং ভোটারদের দেখিয়ে ব্যালটে সিল মারতে বাধ্য করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই প্রার্থীর অভিযোগ, ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। পরে বিএনপির সমর্থকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখান এবং টাকা দিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করেন।
ভোটের হার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্রগুলোতে ৫০ শতাংশ ভোট পড়ার মতো উপস্থিতি দেখা যায়নি। অথচ ফলাফলে ভোট পড়ার হার দেখানো হয়েছে ৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগও করেন তিনি।
ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানান জামায়াতের প্রার্থী। তাঁর অভিযোগ, কারচুপির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রকৃত প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের সরিয়ে দলীয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে পরিচয়পত্রে ছবি রাখা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন।
পরে রাত ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আহত কর্মী-সমর্থকদের দেখতে যান দেলাওয়ার হোসেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অনিয়ম, জালভোট ও হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার বিক্ষোভের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। তবে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সভা-সমাবেশ আয়োজনের ওপর নির্বাচনী আচরণবিধির বিধিনিষেধ থাকায় কর্মসূচি শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই জামায়াত এই উপনির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জাতীয় ইস্যু তৈরির চেষ্টা করেছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দলটির প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা এলাকায় প্রচারণার পাশাপাশি ঢাকায় বসেও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ সেই পরিকল্পনারই অংশ।
অন্যদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করেছেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অন্য তিন প্রার্থী ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।