চিলমারী উপজেলা-তে কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে চলতি পাট মৌসুম নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা। উপজেলার রমনা, অষ্টমীরচর, নয়ারহাট, রানীগঞ্জ ও থানাহাট ইউনিয়নের বহু এলাকায় এখনো জমিতে পাটের বীজ বোনা সম্ভব হয়নি। কোথাও বপন করা বীজ পানিতে পচে গেছে, আবার কোথাও বাড়ন্ত পাটখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্চের মাঝামাঝি শুরু হওয়া পাট আবাদ সাধারণত জুলাই-আগস্টে কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। তবে এবারের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে পুরো মৌসুম নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রাজারহাট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী আরও তিন দিন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঈদের আগ পর্যন্ত থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও হতে পারে। ফলে দ্রুত মাঠের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
চিলমারী উপজেলা কৃষি অফিস বলছে, যেসব জমিতে পানি জমে আছে সেখান থেকে দ্রুত পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। এজন্য জমির আইল কেটে পানি নামানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, দীর্ঘ সময় জমিতে পানি আটকে থাকলে পাটের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বীজ বপনের ৪৫ দিনের মধ্যে যদি টানা তিন দিনের বেশি গোড়া পানির নিচে থাকে, তাহলে শিকড়ে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ হয়ে চারা হলুদ হয়ে মারা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আইল কেটে পানি সরানো সম্ভব না হলে শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশন করতে হবে। বিকল্প হিসেবে কোদাল দিয়ে ক্ষেতের মাঝখান ও চারপাশে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ ফুট গভীর নালা তৈরি করে তা নিচু স্থানের একটি বড় গর্তের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে যেসব কৃষকের বীজ নষ্ট হয়ে গেছে বা এখনো বপন করা হয়নি, তাদের জন্য কৃষি বিভাগ বিকল্প হিসেবে বারি তোষাপাট-৯ জাতের সুপারিশ করছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এ জাতের পাট ৪০-৫০ দিন বয়সের পর টানা ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত আংশিক জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। এছাড়া এর জীবনকালও তুলনামূলক কম, মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিন।
কৃষি বিভাগ আরও জানিয়েছে, মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পাটের বীজ বপন না করলে পরে আবাদ করা সম্ভব হবে না। তাই বৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত জমি প্রস্তুতের কাজ শুরু করতে হবে। একসঙ্গে অনেক কৃষক মাঠে নামলে ট্রাক্টরের সংকট দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
চিলমারী ইউনিয়নের কৃষক জাহাঙ্গীর জোদ্দার বলেন, গত বছর তিনি ৩০ একর জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। এবার বৃষ্টির কারণে মাত্র ১০ একরে আবাদ করতে পেরেছেন।
একই এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “চরে পাটই আমাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু বৃষ্টি সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছে।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার চিলমারীতে ৩ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হেক্টর জমি ইতোমধ্যে জলমগ্ন হয়েছে।
আবহাওয়া কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, গত ১০ দিনে, অর্থাৎ ১৫ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত জেলায় ৩৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অস্বাভাবিক।
কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বীজ সংগ্রহ ও ক্ষতির তথ্য নথিভুক্ত করতে কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিস বা স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।