মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আদিতমারীতে বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষ, ছুরিকাঘাতে কিশোর নিহত ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদন খারিজ পীরগঞ্জে মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ গঠনে সেমিনার অনুষ্ঠিত রোগী হয়রানির অভিযোগে দালালকে দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করালো ছাত্রদল ছয় দফা দাবিতে রংপুরে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি ও মানববন্ধন মিঠাপুকুরে বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে ৫ মৃত্যুর ঘটনায় দুই আসামি গ্রেপ্তার নির্বাচিত হওয়ার একদিন পরই বিসিবির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ মীর শাকরুল আলম সীমান্তের কর্ণফুলী নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার বাজেটের অর্থ অপচয়ের অধিকার কাউকে দেয়নি জনগণ: চরমোনাই পীর সৈয়দপুরে লাশ নিয়ে এলাকাবাসীর থানা ঘেরাও

কতবার কইছি বইন দরজাটা খুল, সে খুলে নাই : আদালতে রামিসার মা

  • সবশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১৫ জন সংবাদটি দেখেছেন

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার।

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। সাক্ষীর ডকে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দেওয়ার সময় কিছু ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে পরে তাদেরকে বসার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হয়।

এর আগে সকাল ৯টার পর দুই আসামিকে বিচারিক আদালতে তোলা হয়। পরে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। ১০টা ৩৯ মিনিটে সাক্ষ্য দিতে মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লাকে ডেকে নেন বিচারক। বিচারক তার নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে তিনি এসবের উত্তর দেন।

এরপর তিনি জবানবন্দিতে বলেন, আমি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। বনানীর কাকলীর অফিসে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী পারভীন আক্তার আমাকে ফোন দিয়ে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর আমি বাসায় ফিরে আসি। এসে দেখি, আমার বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। দৌড় দিয়ে আমার ফ্ল্যাটের সামনে যাই। গিয়ে দেখি, সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছেন। আমাকে স্ত্রী বলতে থাকেন, পাশের ফ্ল্যাটে (সোহেল রানা ও স্বপ্নার ফ্ল্যাট) রামিসা আটকে আছে। সেখানে রাজু নামে একজনকে দেখি, দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করছে। আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলেনি। আমি তখন দৌড়ে নিচে যাই। একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করি। পাশাপাশি অন্য লোকজনও ভাঙার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে দরজার তালা ভেঙে যায়। তালা ভাঙার ছিদ্র দিয়ে স্বপ্নাকে দেখতে পান। ভেতরে ঢুকে কমন রুম ও বাথরুমের দরজা বন্ধ দেখতে পান। টয়লেটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। তখন আসামি স্বপ্নাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আসামিরা যেই রুমে বসবাস করেন, সেই রুমও বন্ধ ছিল। উপস্থিত একজন স্টিলের খাট উঁচু করে দেখেন বালতির ভেতর রামিসার মাথা। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে থানায় গিয়ে আমি এসব কথা বলে মামলা করেছি।

সকাল ১০টা ৫৬ মিনিটে জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ জেরা করেন। জেরায় তিনি একাধিক প্রশ্ন করেন। জেরাতে তিনি জানতে চান, তার স্ত্রী তাকে কখন ফোন করেছিল। উত্তরে জানান, সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে কল দিয়েছিল। তখন কোথায় ছিলেন প্রশ্নের জবাবে বলেন, অফিসে ছিলাম। কিভাবে ও কখন বাসায় আসেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসে করে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় আসি। হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজা ভাঙতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০-২৫ মিনিট সময় লেগেছিল। আপনি তো পুরো বিষয় নিজের চোখে দেখেননি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,-‘যতটুকু দেখেছি ততটুকু বলেছি।’

আসামির সঙ্গে কি কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল নাকি, উত্তরে জানান, তাকে জীবনেও দেখিনি। আপনি মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন প্রশ্নে জানান, সত্য নয়। পরে বেলা ১১টায় তার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়।

এরপর মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। বেলা ১১টা ২ মিনিটে তাকে সাক্ষী সেলে নেওয়া হয় এবং শপথ পড়ানো হয়। আদালত ঘটনার তারিখ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি ছিল ১৯ তারিখের। ঘটনার দিন তিনি বাসায় রান্না করছিলেন এবং রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাইসা আক্তার তার চাচা মোস্তফার বাসায় যেতে চায়। তখন ছোট মেয়ে রামিসাও তার সঙ্গে যেতে চাইলে রামিসাকে বারণ করেন। পরে শুনতে পান ওরা দুজনেই রেডি হচ্ছে। একপর্যায়ে বড় মেয়ে চলে গেলেও সে রামিসাকে সঙ্গে নেয়নি। মা তখন বুঝতে পারেননি যে রামিসাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না।

​পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, এর কিছুক্ষণ পর তিনি পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার চিৎকারের শব্দ শুনতে পান। ভেবেছিলেন পাশের বাসায় একটা বাচ্চা আছে তার শব্দ। তারা যে নেই তার মনেই ছিল না। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে রাইসা বাসায় একা ফিরে আসে। মেয়েকে একা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি একা কেন? রামিসা কোথায়?’ রাইসা জবাবে বলে, ‘রামিসা তো চাচার বাসায় যায়নি।’ এরপর রামিসাকে না পেয়ে তিনি চারদিকে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন এবং লোকজনকে বলেন রামিসাকে দেখেছেন কি না। কিন্তু সবাই বলে কেউ দেখেনি। রামিসার একটি বিড়াল ছিল, তাই সে নিচে গেছে ভেবে নিচেও খোঁজ নেন। কিন্তু নিচের অফিসের লোকজনের ভেতরে খুঁজেও তাকে পাননি। এরপর দোতলার ব্যাচেলর বাসায় খোঁজ নেন, সেখানেও পাননি। তারপর ৩ তলায় ধাক্কাধাক্কি করি, তারা খুলে না। নিচের দিকে তাকায় দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা। অনেক জোরে ধাক্কাধাক্কি করি, ৪ তলা থেকে স্বামী-স্ত্রী (মনি) আসে। ৫ তলা থেকে আসমা নামে একজন আসে। সবাই ধাক্কাধাক্কি করি কিন্তু খুলতে পারিনি।

​তিনি আরও জানান, তারপর মনিকে বলি আপনি নিচে যান লোকজন নিয়ে আসেন। এরপর ১০-১২ জন আসে। আমার স্বামীকে কল দিতে থাকি, সে বলে খুঁজতে থাকো। লোকজন জড়ো হলে আমার স্বামীও আসে। কে জানি লক ভেঙে ফেলে। বাথরুমের সামনে অনেক রক্ত দেখি। স্বপ্নাকে দেখি হাঁটাহাঁটি করতে। রাজু নামের একজন ভিডিও করে। ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের দেহ একজায়গায়, মাথা এক জায়গায়।

আমি তাকে অনেকবার বলেছি বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিচ্ছু হবে না। সে দরজা খুলে নাই। এরপর পুলিশ এসে রামিসার জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে।​

এরপর ভুক্তভোগীর বড় বোন রাইসা আক্তার শিশু হওয়ায় তার জবানবন্দি ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।

আজ আদালতে মামলার আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেবেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন- ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীরা।

এর আগে গতকাল (সোমবার) আদালত সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই দিন বিকেলে মামলার বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।

গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র আমলে নেয়। এর আগে একই দিনে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ।

এ ঘটনায় ২০ মে ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© All rights reserved © 2025 rnbnews24
Theme Download From ThemesBazar.Com