বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষে সোমবার (২২ জুন) চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী। বুধবার (২৪ জুন) বেইজিংয়ে আনুষ্ঠানিক সফর শুরু হওয়ার পর চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার আওতায় তিস্তা নদীর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
উত্তরাঞ্চলের প্রাণ হিসেবে পরিচিত তিস্তা নদী নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীটি নানা সংকটে পড়েছে।
বিশেষ করে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারী এবং লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন, পানির অভাব ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে।
চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, নদীশাসন, ভাঙন প্রতিরোধ, পানি সংরক্ষণ, কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায়: তিস্তা নদীর ১০৮ কিলোমিটার খনন, দুই তীরে ১৭৩ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ, নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি ও সেচ সুবিধা, মৎস্য উৎপাদন প্রকল্প, পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা, নদীর দুই তীরে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, নৌ-চলাচল উপযোগী পানি সংরক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন।
প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার কৃষি উৎপাদন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তিস্তা নদীকে ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ দেখিয়ে আসছে চীন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার (পাওয়ার চায়না) মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
চীনা পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই তীরে আধুনিক নগরায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেছেন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা চীন সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। তিস্তা প্রসঙ্গসহ নদী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা হবে।
তিনি আরও জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত কাঠামো, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে।
চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প ছাড়াও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সরাসরি বিমান যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, খরা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করা তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, এবার যেন কেবল আলোচনা নয়, বাস্তবায়নের দিকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, নৌ-যোগাযোগ ও নগরায়ণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।