আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি বাংলাদেশির জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, অভিবাসন ব্যয় কমানো, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিতের মাধ্যমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর।
তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ কর্মীর সম্ভাব্য চাহিদা চিহ্নিত হয়েছে, যা লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অভিবাসন সংস্কারে চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা, বিদেশগমনের ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দালালনির্ভরতা কমাতে বিদেশগমনের পুরো প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।
নুর বলেন, সরকার দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয়ের কাঠামো প্রণয়নের পাশাপাশি অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশের ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদেশি নিয়োগকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি দক্ষ কর্মী নির্বাচন করতে পারবেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও কাজ চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনমিতিক পরিবর্তন ও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এসব অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, এক লাখ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা কার্যকর রয়েছে। তবে বড় পরিসরে নিয়োগের আগে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্কৃতি মূল্যায়ন করছে জাপান।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রসঙ্গে নুর বলেন, স্বচ্ছ ও প্রায় শূন্য ব্যয়ের নিয়োগব্যবস্থা চালুর বিষয়ে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। শিগগিরই মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে এবং বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধনের কাজ শুরু হবে।
প্রবাসীদের জন্য সরকার একটি ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও নিয়েছে। এতে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং সুবিধা ও কিউআর কোডভিত্তিক যাচাইকরণ ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি অভিবাসন ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াও অনলাইনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল, স্কিল ইনভেস্টমেন্ট পার্ক, আবাসন প্রকল্প এবং ‘প্রবাসী সিটি’ নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি, আহত হয়ে দেশে ফেরা কর্মীদের আর্থিক সহায়তা এবং বিপদগ্রস্ত অভিবাসী, বিশেষ করে নারী কর্মীদের পুনর্বাসন কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদেশে বেশি কর্মী পাঠানো নয়, বরং তারা যেন নিরাপদে অভিবাসন করতে পারেন, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করা।
সূত্র : বাসস