দীর্ঘ ৩১ বছরের সরকারি কর্মজীবনের ইতি টানলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ছিল তার শেষ কর্মদিবস। এ উপলক্ষে দুদকের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা জানানো হয়।
সহকর্মীদের কাছে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ একজন সৎ, নিরহংকার ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে নীরবে দায়িত্ব পালন করাই ছিল তার কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দুদকের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম। এ সময় কমিশনের মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক সহকর্মী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
অবসর-পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন এবং সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগ পর্যন্ত প্রায় তিন বছর এ পেশায় যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “অবসরে আমি আবার সাংবাদিকতায় ফিরতে চাই। বাকি জীবন লেখালেখি ও সাংবাদিকতার মধ্য দিয়েই কাটাতে চাই।”
১৯৯৫ সালে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে (বিসিবি) জেলা দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ। পরে ব্যুরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মাঠপর্যায়ের তদন্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে করতে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আইন ও ব্যবসায় প্রশাসনেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। দুর্নীতি দমন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও তদন্ত কৌশল বিষয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
দুদকের গোয়েন্দা কার্যক্রমে তার দক্ষতা ছিল বিশেষভাবে স্বীকৃত। সহকর্মীদের ভাষ্য, অভিযোগের পেছনের তথ্য, নথি ও আইনি ভিত্তি যাচাই না করে তিনি কখনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ও তদন্তে তার মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
২০২৫ সালে তিনি মহাপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। দায়িত্ব পালনকালে প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
সহকর্মীদের দাবি, কর্মজীবনে কখনো অন্যায় চাপ বা ক্ষমতার কাছে আপস করেননি আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ। এ কারণে একাধিকবার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হলেও নিজের নীতি থেকে সরে আসেননি।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহিদ স্যার দায়িত্বকে কখনো চাকরি হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে দেখতেন। কম কথা বলতেন, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে।”
শেষ কর্মদিবসের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আজকের পর থেকে আমি মুক্ত। দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অত্যন্ত চাপের। তবে এই চাপ ছিল দায়িত্ববোধের, নিজের প্রতি নিজের কমিটমেন্টের।”
ব্যক্তিগত জীবনে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদের সহধর্মিণী বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা এবং দেশের একজন স্বনামধন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ।