নায়ক রাজ্জাক শুধু অভিনয়েই নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করেননি, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ২০টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন তিনি। আর নির্মাতা রাজ্জাকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল কাজের ক্ষেত্রে আপসহীনতা। দৃশ্য নিজের মনের মতো না হওয়া পর্যন্ত তিনি শুটিং শেষ করতে চাইতেন না।
১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর শরণার্থী হয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর জহির রায়হানের ‘বেহুলা’য় নায়ক হিসেবে সুযোগ পান। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় ‘নায়করাজ’।
অভিনয়ের পাশাপাশি ১৯৭৪ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রাজ্জাক। অবশ্য পরিকল্পনা করে নয়, এক বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিচালনায় এসেছিলেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক জানিয়েছিলেন, সিনেমাটির প্রযোজক ও সম্পাদক বশির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকেই ছবিটি নির্মাণের দায়িত্ব দেন।
এরপর ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বদনাম’, ‘অভিযান’, ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’, ‘সৎ ভাই’, ‘বাবা কেন চাকর’সহ একাধিক সিনেমা পরিচালনা করেন তিনি।
পরিচালক রাজ্জাক গল্পকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বিশেষ করে সামাজিক গল্পের প্রতি তাঁর আলাদা আগ্রহ ছিল। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দর্শকের আবেগকে স্পর্শ করতে না পারলে শুধু অ্যাকশন, নাচ ও গান দিয়ে একটি সিনেমাকে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য দেওয়া সম্ভব নয়।
তাঁর মতে, বাঙালি দর্শককে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে গল্পে হাসি-কান্না ও আবেগ থাকতে হবে। সামাজিক গল্পের সিনেমাই দর্শককে বারবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনে বলে মনে করতেন তিনি।
নির্মাতা রাজ্জাক ছিলেন বেশ কঠোর। কোনো দৃশ্য ঠিকভাবে ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। অভিনয়শিল্পীদের ক্ষেত্রেও তারকা পরিচয়ের চেয়ে চরিত্র ও দৃশ্যের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
‘চাপা ডাঙ্গার বউ’ সিনেমার একটি দৃশ্যের কথা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন রাজ্জাক। ওই দৃশ্যে এ টি এম শামসুজ্জামানকে বাপ্পারাজকে কাঠের টুকরো দিয়ে মারতে হতো। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও দৃশ্যটি ঠিকভাবে হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত রাজ্জাক নিজেই অভিনয়ের ধরন দেখিয়ে দেন। পরে দৃশ্যটি এমনভাবে ধারণ করা হয়, যা তাঁর মতে দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
এই ঘটনার পর এ টি এম শামসুজ্জামান তাঁর ওপর কিছুটা ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন। তবে রাজ্জাক পরে তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, দৃশ্যটি ঠিকভাবে পাওয়ার জন্যই তাঁকে কঠোর হতে হয়েছিল।
রাজ্জাকের নির্মাতা সত্তার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় শাবানাকে নিয়ে একটি শুটিংয়ের ঘটনায়। তখন শাবানা ছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। কিন্তু রাজ্জাকের সেটে তারকা হিসেবে কোনো বিশেষ সুবিধা তিনি পাননি।
একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় শাবানাকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। প্রায় আট ঘণ্টা শুটিংয়ের পর দৃশ্যের শেষে শাবানা সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, শুটিং শেষে তিনি শাবানাকে বুঝিয়েছিলেন, দৃশ্যটির বাস্তবতা ধরে রাখতেই তাঁকে এমনভাবে কাজ করাতে হয়েছিল। শাবানাও বিষয়টি বুঝেছিলেন।
নায়করাজ রাজ্জাক ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মারা যান। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নির্মাণের গল্পও বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা এবং কাজের প্রতি আপসহীন মনোভাবের সাক্ষ্য হয়ে আছে।