জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং যুদ্ধজয়ের পর অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পক্ষে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও দেশটির তেলসম্পদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে-ই পাবে, এটাই নিয়ম।’
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী তেলসম্পদ-সংক্রান্ত ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে সেই প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে-ই পাবে, এটাই নিয়ম। সে কথা তো আপনারা জানেন, তাই না?’
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেলসম্পদ এখন তাদের হাতে।
একই ভাষণে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে।
এ প্রসঙ্গে ইরানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’
ইরানকে এমনভাবে ‘নরকে পাঠানোর’ কথাও বলেন ট্রাম্প, যাতে দেশটির টিকে থাকা কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না থাকে।
জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের এমন কঠোর ভাষা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণেও উত্তর কোরিয়াকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।
তবে সেই ভাষণেই ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো দেশের ওপর নিজেদের জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায় না; বরং শক্তিশালী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পাশাপাশি কাজ করবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি এবং একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগ ঠেকানো।
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি সাধারণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকারসহ সনদে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষাকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রভাববলয়ের ধারণাও উঠে আসে।
১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের নীতির মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ স্বার্থের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব নীতি বিভিন্ন সময়ে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, শুধু পশ্চিম গোলার্ধ নয়, ‘আমাদের অঞ্চল এবং সারা বিশ্বে’ প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
ভাষণের অন্য অংশেও আন্তর্জাতিক ও বহুপক্ষীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) ‘আমেরিকাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আদালতটি ত্যাগ করার আহ্বান জানান তিনি। আইসিসি জাতিসংঘের কোনো অঙ্গ নয়; রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক আদালত।
ট্রাম্প আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রস্তাবিত বৈশ্বিক কার্বন শুল্কেরও বিরোধিতা করেন। ইউনেসকোর ভূমিকার সমালোচনার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া ট্রাম্পের এই ভাষণ শুধু আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের উদ্দেশে ছিল না—দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষণে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি সামরিক শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে বিশেষভাবে সামনে আনেন ট্রাম্প।
সর্বশেষ রয়টার্স-ইপসস জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ৩২ শতাংশে নেমেছে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর এই কঠোর অবস্থান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবেও বিশ্লেষিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার আট দশকের বেশি সময় পর একই মঞ্চে যুদ্ধজয়ের সঙ্গে পরাজিত পক্ষের সম্পদে অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারণা তুলে ধরে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।