সরকার, পুলিশ ও বিভিন্ন বাহিনী নিয়ে বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনায় আসা রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসানকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা–ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার ক্যান্টনমেন্ট থানায় রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছে পুলিশ। এরপর তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে।
অডিওতে তাঁকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, পুলিশের সক্ষমতা এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়। একই সঙ্গে পুলিশে বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগও করতে শোনা যায় তাঁকে।
অডিওটি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পরদিন রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে তাঁকে রাজধানীর রাজারবাগে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয় তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ডিএমপি।
ওই দিন রাতে রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। তবে পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এরপর প্রায় এক সপ্তাহ রাকিবুল হাসান কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ।
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, রাকিবুলকে প্রত্যাহারের পর তাঁর বিরুদ্ধে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বুধবার ডিএমপি কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’
অডিওতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তাঁকে মন্তব্য করতে শোনা যায়।
তিনি বলেন, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই।’
একই অডিওতে ওসি পদে পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের পদায়নের অভিযোগও করেন রাকিবুল।
‘মনির’ নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক ওসি পদায়নে ভূমিকা রাখছেন—এমন অভিযোগ করে অডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পোস্টিং পাইতেছে, তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পোস্টিং হইতেছে।’
এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে মামলা ও তাঁকে আদালতে পাঠানোর বিষয়ে ডিএমপি একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক বক্তব্য’ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি পুলিশ পরিদর্শক মো. রাকিবুল হাসানকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ কারণে সাত দিনের পুলিশ হেফাজত চেয়ে আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।