পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা মাহমুদ খান আচাকজাই।
তাঁর দাবি, অতীতে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও বেনজির ভুট্টোকে যেভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল, ইমরান খানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পেশোয়ার হাইকোর্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মাহমুদ খান আচাকজাই।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীদের সমঝোতার মাধ্যমে দেশ ছাড়তে হয়েছে।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন নওয়াজ শরিফ। এরপর তাঁকে বন্দী করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সমঝোতার ভিত্তিতে ২০০০ সালে পাকিস্তান ছেড়ে যান নওয়াজ শরিফ। ওই সমঝোতায় সৌদি আরব ও লেবাননের নেতাদের মধ্যস্থতার ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফারুক লেঘারি বেনজির ভুট্টোর সরকার বরখাস্ত করেন।
১৯৯৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পরাজিত হয়। পরে বেনজির দেশ ছেড়ে দুবাই ও লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান।
মাহমুদ খান আচাকজাইয়ের অভিযোগ, বর্তমানে ইমরান খানকেও একই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
তবে ইমরান খানকে এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না বা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে কি না, তার স্বাধীন নিশ্চিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান আচাকজাইয়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তেহরিক-ই-তাহাফুজ-আইন-ই-পাকিস্তানের (টিটিএপি) নেতারা।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন সরদার আখতার মেঙ্গল ও আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস।
মাহমুদ খান আচাকজাই জানান, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই একটি সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এমনকি রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কারাবন্দী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা।
তাঁর অভিযোগ, ইমরান খানের সঙ্গে অন্যদের সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
মাহমুদ খান আচাকজাই বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংসদকে কার্যকর ও ক্ষমতাবান করা জরুরি।
তাঁর মতে, সংসদের ক্ষমতা ও ভূমিকা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের চলমান সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাহমুদ খান আচাকজাই।
প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী ও কয়েকজন আইনপ্রণেতার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী কোথায় আছেন, তা জানার সাংবিধানিক অধিকার তাঁদের রয়েছে।
সম্প্রতি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার।
এর আগে প্রদেশটিতে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের সরকার ক্ষমতায় ছিল।
প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে যথাযথ সহযোগিতা করছে না—এমন অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে বিরোধী দলগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে।
এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি শুক্রবার লাহোরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করেন।
তিনি দাবি করেন, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর হতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
তবে তিনি ওই নেতার নাম প্রকাশ করেননি।
তাঁর বক্তব্যকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মহসিন নাকভির অভিযোগ, যাঁরা বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করছেন, তাঁদের কেউ কেউ অতীতে সেই ব্যবস্থা থেকেই রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন।
ইমরান খানের কারাবাস, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন এবং বিরোধী দলগুলোর নতুন কর্মসূচির পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
একদিকে বিরোধী দলগুলো সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক প্রশাসন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইমরান খানকে সমঝোতায় বাধ্য করার অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগের বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট জবাবের তথ্য পাওয়া যায়নি।