জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ হলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে নিজের দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। শুধু দখলে থাকা, দলিলের দাবি করা কিংবা নামজারির কথা বললেই নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের এক মামলায় সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে এ পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ। গত ১০ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়। পরে ১৮ অক্টোবর তা প্রকাশ করা হয়।
মামলার বাদী মো. ইসহাক আলী (মৃত) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দাবি, ১৯৪৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁরা বিরোধপূর্ণ জমি কেনেন এবং পরবর্তী সময়ে তা ভোগদখল করেন। তাঁদের অভিযোগ, জমির খতিয়ানে ভুলভাবে অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালে একটি স্বত্ব মামলায় রায় ও ডিক্রি পাওয়ার ভিত্তিতেও তাঁরা জমিটির মালিকানা দাবি করেন।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে তাঁদের নামজারি বাতিল করে জমিটি অন্যদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। নিজেদের অধিকার রক্ষায় মামলা করার পাশাপাশি জমির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান তাঁরা।
অন্যদিকে, সরকারি পক্ষের দাবি, জমিটি অর্পিত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। বাদীপক্ষের উপস্থাপিত দলিল এবং আগের মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও আপত্তি তোলে সরকারপক্ষ।
প্রথমে বিচারিক আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করেন। এরপর অতিরিক্ত জেলা জজ মামলাটি ফেরত পাঠিয়ে জমিটি অর্পিত সম্পত্তির আওতাভুক্ত কি না এবং এ অবস্থায় মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী চলতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন বাদীপক্ষ।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীপক্ষের মালিকানা দাবির অন্যতম ভিত্তি ১৯৪৪ সালের একটি অনিবন্ধিত দলিল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলার রেজিস্টারের সঙ্গে আদালতে উপস্থাপিত রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপির মিল পাওয়া যায়নি।
বাদীপক্ষ জমির নামজারি সংশোধন এবং সংশোধিত এসএ খতিয়ানের কথা বললেও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বা নামজারির নথি আদালতে জমা দিতে পারেননি। ফলে জমিটির মালিকানা দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করেন আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে আবেদনকারীর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী দায়ের করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ সময় অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারাও আলোচনা করেন আদালত। তবে মূল মামলার প্রয়োজনীয় আরজি হাইকোর্টে উপস্থাপন না করায় মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি আদালত।
বাদীপক্ষ মালিকানা দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ দেখাতে পারেনি এবং নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো আইনগত ভুলও পাওয়া যায়নি বলে রায়ে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট। পরে সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে আগের অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করেন আদালত।
একই সঙ্গে মামলাটি তখনও নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে যত দ্রুত সম্ভব তা নিষ্পত্তির জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।