আরএনবি ডেস্কঃ নতুন বছর এলেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হতো শিক্ষাবর্ষ। ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি পালিত হয়ে আসা ‘বই উৎসব’ সেই প্রত্যাশারই প্রতীক। তবে চলতি শিক্ষাবর্ষে সেই ধারায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। প্রাথমিক স্তরের বই সময়মতো পৌঁছালেও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বই ছাড়াই শুরু হয়েছে নতুন বছর। ফলে দেশের প্রায় অর্ধকোটি শিক্ষার্থী নতুন বই ছাড়াই ক্লাসে বসতে বাধ্য হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে গড়ে প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন এখনো কোনো পাঠ্যবই হাতে পায়নি। বই বিতরণ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের অসংগতি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)–এর বিতরণ শাখার তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের মোট ২১ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের বিপরীতে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ১৬ কোটি ১০ লাখ কপি, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ। অথচ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন, বছরের প্রথম দিনেই ৮৩ শতাংশ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে। আবার এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী বিতরণ হয়েছে ৭১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বই। মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও ভিন্ন। বিভিন্ন জেলার শিক্ষা অফিস ও বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক স্কুলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ১২টি বইয়ের মধ্যে মাত্র দুই থেকে চারটি বই দেওয়া হয়েছে। এই তিন শ্রেণিতে গড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এনসিটিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে সংকটজনক অবস্থা অষ্টম শ্রেণিতে। এ শ্রেণিতে ৪ কোটি ২ লাখ বইয়ের চাহিদার বিপরীতে ছাপা হয়েছে প্রায় ৫১ শতাংশ। সপ্তম শ্রেণিতে ছাপা হয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ বই। ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও তা পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। বই না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বই কিংবা খাতায় নোট লিখে পাঠদান চালানো হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষার্থী এখনো বই পায়নি তারা এনসিটিবির ওয়েবসাইট থেকে পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ কপি ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবে। বই সরবরাহে বিলম্বের পেছনে এনসিটিবির দরপত্র প্রক্রিয়ার জটিলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্র পছন্দের ছাপাখানাকে কাজ পাইয়ে দিতে বই ছাপার কাজ নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শুরু করে। এতে পুরো প্রক্রিয়াই পিছিয়ে যায়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হবে। রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে এবার আনুষ্ঠানিক বই উৎসব হয়নি বলেও তিনি জানান। তবে এনসিটিবির দেওয়া তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারের এই দাবির বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বগুড়া, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, নওগাঁ ও সিলেট বিভাগের শিক্ষা অফিসগুলোর তথ্য বলছে, অনেক জেলায় এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মাধ্যমিক বই পৌঁছেনি। শুধু সিলেট বিভাগেই প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী নতুন বই ছাড়া ক্লাস শুরু করেছে। শিক্ষাবিদেরা বলছেন, বছরের শুরুতে বই না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, এটি শিক্ষার মান ও মানসিক প্রস্তুতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বই বিতরণ নিশ্চিত না হলে এর প্রভাব পুরো শিক্ষাবর্ষজুড়েই থেকে যাবে।