পৌষ শেষ না হতেই উত্তরাঞ্চলে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়ে রংপুরসহ উত্তরের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা নেমে এসেছে এক অঙ্কের ঘরে। যেন খোলস ছেড়ে স্বরূপে ফিরেছে শীত।
শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রোগব্যাধি ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ১৪ দিনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল–এ শীতজনিত বিভিন্ন রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৬ জন। এর মধ্যে সাতজন বয়স্ক এবং নয়জন শিশু।
রমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, শীতের তীব্রতায় হাসপাতালের শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত কয়েক দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক মাহফুজার রহমান বাঁধন বলেন, শীতজনিত রোগবালাই—বিশেষ করে নিউমোনিয়া, কোল্ড ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু ও বয়স্ক মানুষ। গত দুই সপ্তাহে প্রায় সহস্রাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে গরম কাপড় পরানো ও প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, গত দুই সপ্তাহে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবে কেবল শীতের কারণেই মৃত্যু হয়েছে—এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সাধারণত শীতকালে হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিসের মতো রোগ বেড়ে যায় এবং এসব রোগেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, শীতকালীন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোর—দুই জায়গাতেই বেড়েছে।
রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানান, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রংপুরে তাপমাত্রা ছিল ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে সকাল ৬টা ও ৯টায় তা নেমে আসে ১১ দশমিক ৯ ডিগ্রিতে। একই সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটেও তাপমাত্রা ৯ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে।
ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ছিন্নমূল ও নদ-নদী তীরবর্তী মানুষজন। রংপুর জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ শীতার্ত। শুধু রংপুর মহানগরীতেই বসবাস করেন প্রায় ৭০ হাজার ভাসমান মানুষ, যারা রেলস্টেশন, হাসপাতাল ও ফুটপাতে রাত কাটান।
জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়া ও যমুনেশ্বরী নদীবিধৌত চরাঞ্চলের হাজারো পরিবার এখনো শীতবস্ত্র না পেয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, মাঘের আগেই শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। এতে করে শীতার্ত দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।