মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আদিতমারীতে বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষ, ছুরিকাঘাতে কিশোর নিহত ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদন খারিজ পীরগঞ্জে মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ গঠনে সেমিনার অনুষ্ঠিত রোগী হয়রানির অভিযোগে দালালকে দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করালো ছাত্রদল ছয় দফা দাবিতে রংপুরে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি ও মানববন্ধন মিঠাপুকুরে বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে ৫ মৃত্যুর ঘটনায় দুই আসামি গ্রেপ্তার নির্বাচিত হওয়ার একদিন পরই বিসিবির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ মীর শাকরুল আলম সীমান্তের কর্ণফুলী নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার বাজেটের অর্থ অপচয়ের অধিকার কাউকে দেয়নি জনগণ: চরমোনাই পীর সৈয়দপুরে লাশ নিয়ে এলাকাবাসীর থানা ঘেরাও

তথ্য ফাঁস বন্ধে কঠোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: নজরদারিতে কর্মকর্তারা

  • সবশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ জন সংবাদটি দেখেছেন

তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার ‘তথ্য অধিকার আইন’ প্রণয়ন করলেও বাস্তবে জবাবদিহির ঘাটতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা কৌশলে সেই আইন কার্যকর হওয়া অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে দীর্ঘ সময় পর তথ্য মিললেও তা অনেক ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা হারায়। ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমকে ‘সূত্রনির্ভর’ তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তবে, তথ্যের সেই প্রবাহে এবার নতুন করে লাগাম টানছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপনীয় তথ্য’ গণমাধ্যমে প্রকাশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ও মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আদেশে ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর পরিপন্থী কোনো তথ্য ফাঁস হলে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র এবং ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কী ইঙ্গিত দিচ্ছে এই হুঁশিয়ারি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের প্রকৃত গোপনীয় বিষয় ছাড়া সাধারণ প্রশাসনিক তথ্য জনস্বার্থেই প্রকাশযোগ্য হওয়া উচিত। সরকার কী করছে বা কীভাবে করছে, তা জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। তবে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কড়া সতর্কতা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের ভাষ্য, কোনো প্রক্রিয়া যখন অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তখনই গোপনীয়তার দেয়াল আরও শক্ত করা হয়।

সম্প্রতি এক আদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর পরিপন্থী কোনো তথ্য ফাঁস হলে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্দেশনা শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি নতুন করে কিছু প্রশ্নও সামনে এনেছে। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার সুরক্ষা কি আসলেও জোরদার হচ্ছে, নাকি প্রশাসনের অস্বচ্ছতা ও তথ্য গোপনের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে?

কেন এই নির্দেশনা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে পুলিশের বদলি-পদায়ন, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিবেদন, তদন্তের অগ্রগতি এবং কিছু কৌশলগত নীতি-প্রস্তাব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু ছিল প্রকাশিত নথির হুবহু অনুলিপি, আবার কিছু ছিল গোপন বৈঠকের সিদ্ধান্তের সারসংক্ষেপ। মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এগুলো ‘তথ্য ফাঁস’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রশাসন অনুবিভাগ থেকে এই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকতার পথে নতুন বাধা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাংবাদিক বলেন, এসব তথ্যের বড় অংশই ছিল জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য। তবে নতুন নির্দেশনার ফলে তথ্য ফাঁস মনিটরিং, গোপনীয়তার কড়াকড়ি এবং শাস্তির হুমকি— সবমিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ আরও সংকুচিত হচ্ছে। তাদের দাবি, নির্দেশনার পর অনেক কর্মকর্তা গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ কথা বললেও প্রকাশ করছেন গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা।

সেকেলে আইনের আধুনিক প্রয়োগ

নির্দেশনায় ১৯২৩ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর কথা বলা হয়েছে। এই আইন রাষ্ট্রীয় নথিকে ‘গোপন’ ঘোষণার ব্যাপক সুযোগ দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, কূটনীতি বা সামরিক পরিকল্পনা গোপন থাকা যৌক্তিক হলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি-পদায়ন বা আর্থিক স্বচ্ছতার তথ্য এই আইনের আড়ালে ঢেকে রাখা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাংবাদিক বলেন, এসব তথ্যের বড় অংশই ছিল জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য। তবে নতুন নির্দেশনার ফলে তথ্য ফাঁস মনিটরিং, গোপনীয়তার কড়াকড়ি এবং শাস্তির হুমকি— সবমিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ আরও সংকুচিত হচ্ছে। তাদের দাবি, নির্দেশনার পর অনেক কর্মকর্তা গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ কথা বললেও প্রকাশ করছেন গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এখন চাইলেও আমি কোনো গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। সাধারণ আলাপেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’ অন্য এক কর্মকর্তা অবশ্য ভিন্ন মত দিয়ে বলেন, ‘সংবেদনশীল তথ্য বাইরে গেলে নিরাপত্তা কাঠামো ঝুঁকিতে পড়ে, তাই মনিটরিং জরুরি। তবে, সব তথ্য চেপে রাখা ঠিক নয়।’

শাস্তির আশঙ্কা ও নীরবতার সংস্কৃতি

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তথ্য ফাঁস হলে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা এমনকি চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তি হতে পারে। এতে প্রশাসনের ভেতরে অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে সব তথ্য গোপন রাখলে জবাবদিহির জায়গাটি হারিয়ে যায়।

তথ্য অধিকার বনাম গোপনীয়তা

একদিকে তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে তথ্য জানার অধিকার দিয়েছে, অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট গোপন নথি প্রকাশকে দণ্ডনীয় করেছে। এই দুই আইনের মুখোমুখি সংঘর্ষই এখন বড় টানাপোড়েন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের নিরাপত্তা ও নাগরিকের জানার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়বে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

জানতে চাইলে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট একটি ঔপনিবেশিক আইন, যা বর্তমান সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল বা কূটনৈতিক নথি গোপন রাখা অবশ্যই যৌক্তিক। তবে, বদলি-পদায়ন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গোপন করার চেষ্টা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ও তথ্য অধিকার আইনের মূল দর্শনের বিরুদ্ধে যায়।’

“স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনা আইনের ব্যাখ্যার চেয়ে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরিতে বেশি কার্যকর হবে। যখন একটি প্রশাসনিক আদেশে শাস্তির ভয় দেখানো হয়, তখন কর্মকর্তারা আইন কী বলে সেটা নয়, উপরের নির্দেশ কী সেটাই অনুসরণ করেন। ফলে আইনের শাসনের বদলে আদেশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “এ ধরনের নির্দেশনার মূল লক্ষ্য তথ্য সুরক্ষা নয়, বরং ‘ডিটারেন্স’ বা ভয় তৈরি করা। এতে কর্মকর্তারা সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করে চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন। প্রশাসনের ভেতরে নীরবতার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে অপরাধ বা অনিয়মের রিপোর্টিং স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। ফলে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার শনাক্ত হওয়ার আগেই চাপা পড়ে যায়।”

‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা যায়, তথ্য গোপনের সংস্কৃতি যত শক্ত হয়, রাষ্ট্রীয় অনিয়ম তত গভীরে প্রোথিত হয়’— মন্তব্য করেন তিনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘সব তথ্যকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ক্লাসিক প্রশাসনিক প্রবণতা। যে রাষ্ট্র তথ্যকে শত্রু মনে করে, সেখানে নিরাপত্তা নয় বরং নজরদারি বাড়ে। আর অতিরিক্ত নজরদারি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থান কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা— এই তিনটি ক্ষেত্র রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই সময়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ মানে বর্ণনাভিত্তিক ক্ষমতা নিজের হাতে রাখা।’

তার মতে, ‘যখন সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র সমালোচনামূলক তথ্যকে নিরাপত্তা ছাতার নিচে ঢুকিয়ে দেয়, তখন বিরোধী মত ও প্রশ্ন তোলার সুযোগ সংকুচিত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্পেস সংকোচনের দিকেই ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে তথ্যের অংশীদার না মনে করে, তাহলে আস্থার সংকট তৈরি হয়, যার রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দিতে হয়’।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© All rights reserved © 2025 rnbnews24
Theme Download From ThemesBazar.Com