আরএনবি ডেস্কঃ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত টানা সাত মাস ধরে রফতানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশের মোট রফতানি আয় ৩.১৩ শতাংশ কমে ৩১.৯০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩২.৯৪ বিলিয়ন ডলার।
এই সময়ে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয়ও কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে পোশাক রফতানি ১৩.২১ শতাংশ কমে ২.৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এ খাতের রফতানি আয় ৩.৭৩ শতাংশ কমে ২৫.৭৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারির পর ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বর্তমানে সেই প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বাজারগুলোতে আমদানি প্রবণতা ধীরগতির হওয়ায় বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
এখন অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির মূল্যমান ২০২১ সালের কাছাকাছি বা তার নিচে অবস্থান করছে। ফলে একই বাজারে অংশীদারিত্ব ধরে রাখতে রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
মহামারির সময় অতিরিক্ত মজুতের অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা এখন পোশাক কেনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক। তারা এখন ছোট আকারের অর্ডার দিচ্ছেন এবং দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন।
ক্রেতারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রতিযোগিতামূলক দাম,সময়মতো সরবরাহ ,আন্তর্জাতিক মানের শ্রম ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স,কঠোর ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা এর ফলে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কয়েক মাস ধরে রফতানি আয় কমছে এবং এই ধারা জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তার মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানিতে প্রভাব পড়েছে। এছাড়া নির্বাচনী সময়সূচি ও বন্দর কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণেও কিছু ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্ব পোশাক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চীন শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও দেশটির বাজার অংশ ধীরে ধীরে কমছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এখন ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল অনুসরণ করছে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা ভিয়েতনামকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।তবে বাংলাদেশ এখনও বৈশ্বিক পোশাক বাজারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। বিশেষ করে বড় পরিসরে উৎপাদন এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া গত এক দশকে দেশের অনেক কারখানা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে বড় বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরি থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যা ক্রেতাদের আস্থা বাড়িয়েছে।শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে শুধু কম দামের ওপর নির্ভর করে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ ক্রেতারা এখন গুণগত মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দ্রুত সরবরাহ এবং টেকসই উৎপাদনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে বাংলাদেশকে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।