মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানী ও চট্টগ্রামের তিনটি স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে কারখানা, গুদাম ও বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনাল। আগুনে ক্ষতির অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ। কেউ হারিয়েছেন পণ্য, কেউ হারিয়েছেন আজীবনের সঞ্চয়, কেউ হারিয়েছেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
রাজধানীর রূপনগরে একটি কেমিক্যাল গোডাউন ও পোশাক কারখানায় গত ১৪ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম ইপিজেডে অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইলস কারখানায় আগুনে শতাধিক শ্রমিক আহত হন এবং বিপুল পরিমাণ পণ্য পুড়ে যায়। আর ১৮ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগলে ছয় ঘণ্টার জন্য ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিমানবন্দরের আগুনে রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলছে রয়টার্স ও ইকনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদন।
নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুরের এক তরুণ উদ্যোক্তা একটি নিম্ন–মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। কয়েক মাস আগে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ছোট আকারে অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন। চীনের আলীবাবা ডটকম থেকে তিনি প্রায় এক লক্ষ টাকার পণ্য অর্ডার করেন—যা ৮ অক্টোবর গুয়াংজুর “বি-৯ ওয়ারহাউজ (BDX Express Cargo)”–এ পৌঁছে এবং ১০–১৫ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠানোর কথা ছিল।
কিন্তু ১৮ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরের আগুনে তার পণ্যসহ সব আশা শেষ হয়ে যায়। চীনের গুদামে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, “আমাদের দায় শেষ চীনে পণ্য হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।”
বাংলাদেশ কার্গো অফিস জানায়, “মাল বিমানবন্দরে পৌঁছেছিল, কিন্তু ডেলিভারির আগে আগুনে পুড়ে গেছে।”
সেই উদ্যোক্তার এখন একটাই প্রশ্ন— “আমি যার হাতে আমার সব টাকা দিলাম, সেই কেউই দায় নেবে না—তাহলে আমি কোথায় যাব?”
বাণিজ্য আইনজীবীরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনায় দায় নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর— ১. শিপমেন্ট চুক্তি ও ইনকোটার্মস (FOB, CIF, CIP) ২. এয়ারওয়ে বিলের দায়িত্ব নির্ধারণ ধারা ও ৩. কার্গো ইনস্যুরেন্স কভারেজ।
যদি ডেলিভারির আগে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আগুন লাগে, তাহলে দায় হতে পারে বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলার বা এয়ারলাইনের। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারই কোনো “All–Risk Insurance” থাকে না, ফলে তারা আইনগতভাবে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন না।
এক সপ্তাহে তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড—এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য সতর্ক সংকেত। তরুন এই উদ্যোক্তার মতো অসংখ্য ব্যবসায়ী আজ প্রশ্ন করছেন—পণ্য না থাকলে ব্যবসা নেই, কিন্তু ক্ষতির দায় কে নেবে? এ প্রশ্নের জবাবই হয়তো আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে।
সংবাদ সূত্র:- রয়টার্স, এপি, ইকনমিক টাইমস।