বাড়িতে সাজসজ্জার আয়োজন, অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি, খাসি কাটা আর হাসিখুশি মানুষের আনাগোনা— সবকিছুই চলছে বিয়ের আনন্দে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও গভীর শোকের ছায়া রয়ে গেছে রংপুরের তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামের রুপলাল রবিদাসের পরিবারে। আজ (রবিবার) বাবা হারানো নুপুর রবিদাস বসছেন বিয়ের পিঁড়িতে।
এই মেয়ের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়েই প্রাণ হারান বাবা রুপলাল রবিদাস (৪০) ও জামাই প্রদীপ রবিদাস (৩৫)— চুরির অপবাদে নির্মম গণপিটুনির শিকার হয়ে।
বাড়িতে চলছে বিয়ের উৎসব, কিন্তু পরিবারের সবার মুখে অশ্রুর রেখা। নুপুরের সাজসজ্জার মাঝে যেন শূন্যতার হাহাকার— কারণ তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করার মতো আর কেউ নেই। বাবা রুপলাল নিহত হন ৯ আগস্ট রাতে, মেয়ে নুপুরের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়ে।
স্থানীয়দের হাতে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন রুপলাল ও তার জামাই প্রদীপ রবিদাস। ঘটনাটি সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন পরিবার বলছে— “আশ্বাস শেষ, খোঁজ কেউ রাখে না।”
রুপলাল ছিলেন তারাগঞ্জ বাজারের এক জুতা সেলাই মিস্ত্রি। দুই মেয়ে ও এক ছেলের লেখাপড়ার খরচ সামলাতে তিনি হিমশিম খেতেন। স্ত্রী ভারতী রানীও স্থানীয় এক জুতা কারখানায় কাজ করতেন, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেই ভারতী রানীই ধার–দেনা করে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করছেন।
তিনি বলেন, “মেয়ের বিয়েতে অনেক টাকা লাগছে। কেউ সহযোগিতা করলে উপকার হতো। সবাই কথা দিয়েছিল, কিন্তু এখন কেউ আসে না।”
নুপুর রবিদাস বলেন, “আমার বিয়ের আয়োজন হলেও মনের ভেতরে বাবার অভাবই সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমার বাবার হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই জানে, কিন্তু কেউ কিছু করে না।”
তার ভাই জয় রবিদাস বলেন, “বাবা নেই, এখন আমাকে সব কিছু দেখতে হচ্ছে। বিয়ের জন্য অনেক টাকা দরকার। কিন্তু কেউ সাহায্য করছে না।”
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুবেল রানা বলেন, “রুপলালের মেয়ের বিয়ের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে এক লাখ টাকা ও সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবারের জন্য বিধবাভাতা, শিক্ষাভাতা ও ব্যবসার ঘর বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনও নুপুরের বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত।
গত ৯ আগস্ট রাতে রুপলাল ও তার জামাই প্রদীপ রবিদাস বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয়রা তাদের চোর সন্দেহে আটক করে বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গণপিটুনি দেয়। ঘটনাস্থলেই রুপলাল নিহত হন, হাসপাতালে মারা যান প্রদীপ।
এ ঘটনায় পরদিন রুপলালের স্ত্রী ভারতী রানী বাদী হয়ে ৫০০–৭০০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।