জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা নিয়েই বেড়ে ওঠা। কিন্তু প্রতিকূলতা তাকে থামাতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে রংপুরের কাউনিয়ার শিক্ষার্থী কলি রানী।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার কক্ষে অন্য শিক্ষার্থীরা যখন হাতে লিখে উত্তর দিচ্ছিল, তখন কলি রানী পা দিয়ে লিখে পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার এই দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছে।
কলি রানী উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি রুপালী রানীর মেয়ে এবং কাউনিয়া কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। জন্মগতভাবেই তার দুই হাতের কবজি নেই। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনোই জীবনের বাধা হিসেবে মেনে নেয়নি সে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কলি রানী যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত, তখন তার বাবা মনোরঞ্জন রায় মারা যান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট কলি। বাবার মৃত্যুর পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যায় সে। ধীরে ধীরে পা দিয়ে লেখা শিখে নেয় এবং এখন স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের মতোই পরীক্ষা দেয়।
এর আগে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখেই এ গ্রেড অর্জন করেছিল কলি। পরে এসএসসিতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। শুধু লেখালেখিই নয়, পা দিয়েই কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন পরিচালনা করতে পারে সে। পাশাপাশি গান গেয়েও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
কলির ভাই মন্টু রাম রায় বলেন, “জন্ম থেকেই আমার বোনের হাতের আঙুল নেই। অন্যদের মতো কলম ধরতে পারে না। কিন্তু সে কখনো হাল ছাড়েনি। ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা শিখেছে। এখন অনেক দ্রুত লিখতে পারে। আমরা চাই সে তার স্বপ্ন পূরণ করুক।”
পরীক্ষার্থী কলি রানী বলেন, “আমি অনেক বড় হতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও আমি কখনো হার মানতে চাই না।”
কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, “কলি রানী পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। তার এই সংগ্রাম ও মনোবল সত্যিই প্রশংসনীয়।”
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, “কলি রানীর ইচ্ছাশক্তি ও সাহস অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি। আমরা চাই সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তার স্বপ্ন পূরণ করুক। উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।”
স্থানীয়দের মতে, কলি রানীর জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, সফলতার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাস। তার এই অনুপ্রেরণাদায়ী পথচলা সমাজের অনেকের জন্যই সাহস ও আশার বার্তা হয়ে থাকবে।