ঘরোয়াভাবে কাবিন হয়েছিল এক বছর আগে। আগামী ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারিতে আয়োজন করার কথা ছিল আনুষ্ঠানিক বিয়ের অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই আয়োজনের আগেই মৃত্যু হলো রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী জুমরাতুন নেছা বর্ষার (২৪)।
মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও বাবাকে ভিডিও কল করে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন বর্ষা। পরিবারের অভিযোগ, স্বামী নাবিদ হোসাইনের নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে নাবিদের পরিবার ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছে।
এ ঘটনায় বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ নাবিদকে গ্রেপ্তার করেছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে বর্ষাকে মারধর করছিলেন তাঁর স্বামী নাবিদ।
রাত ১২টার দিকে বর্ষা বাবাকে ভিডিও কল করে সাহায্য চান। মেয়ের ফোন পাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে বর্ষার মা-বাবা তাঁর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছান।
সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করছে নাবিদের পরিবার।
পরে বর্ষাকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বর্ষার মা হাসিনা আক্তার দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেননি। মৃত্যুর আগে সাহায্য চেয়ে ভিডিও কল করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
শেখ মনোয়ার হোসেন ও হাসিনা আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে বর্ষা ছিলেন দ্বিতীয়।
উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে তেজগাঁও কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হন তিনি।
কলেজে পড়ার সময় নাবিদ হোসাইনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরিবারের আপত্তি থাকলেও বর্ষা বিয়ের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুই পরিবারের উপস্থিতিতে ঘরোয়াভাবে তাঁদের বিয়ের কাবিন সম্পন্ন হয়।
বর্ষার মায়ের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন আগেই নাবিদ তাঁর মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন।
পরিবারের পরিকল্পনা ছিল, আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের আয়োজন করা হবে।
বর্ষার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি।
প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে মারধরের ঘটনায় বর্ষার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তখন তাঁকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।
পরিবারের দাবি, সে সময় হাসপাতালে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করলেও বর্ষার অনুরোধে তাঁরা কোনো মামলা করেননি।
স্বজনদের অভিযোগ, নাবিদ বর্ষাকে সন্দেহ করতেন এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দিতেন।
নির্যাতনের পর একাধিকবার বাবার বাড়িতে ফিরে গেলেও পরে আবার স্বামীর কাছে চলে যেতেন বর্ষা।
বর্ষার পরিবারের আরও অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই ব্যবসার কথা বলে শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতেন নাবিদ।
কখনো এক লাখ টাকা চাওয়াসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বর্ষার মা।
তাঁর অভিযোগ, মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার কথা ভেবে পরিবারের পক্ষ থেকে এসব দাবি পূরণ করা হয়েছিল।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, যৌতুকের দাবিতে বর্ষাকে বিভিন্ন সময়ে মারধরের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় বর্ষার বাবা হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনার রাতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নাবিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে নাবিদের বাবা মঞ্জুর হোসেন ও মা নুরুন নাহারের বক্তব্য জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্ষার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।