এক কেজি মাল্টা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। আপেলের কেজি কোথাও ৪০০ টাকা ছাড়িয়েছে। এমনকি দেশি কলার দামও কয়েক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে একসময় সাধারণ মানুষের নিয়মিত খাবারের তালিকায় থাকা ফল এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ ফল আমদানি কমলেও শুল্ক–কর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ফল আমদানি থেকে সরকারের আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
২০২০ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায়।
গত সেপ্টেম্বরে দাম আরও বেড়ে হয়েছিল ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা।
শুধু বিদেশি ফল নয়, দেশি ফলের দামও বেড়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে এক হালি সাগর কলা পাওয়া যেত ২০ থেকে ২৫ টাকায়। বর্তমানে একই পরিমাণ কলা কিনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নিয়মিত ফল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০–২১ অর্থবছরে আমদানি করা বিভিন্ন তাজা ফলের ওপর মোট শুল্ক–করভার ছিল ৮৯ শতাংশ।
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ শতাংশে।
অর্থাৎ শুল্ক–কর গণনার ভিত্তিমূল্য ১০০ টাকা হলে তার বিপরীতে মোট করভার দাঁড়ায় ১২২ টাকা।
আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করসহ বিভিন্ন করের কারণে ফলের দাম বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে দেশে ফল আমদানি হয়েছিল প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টনে।
অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ফল আমদানি কমেছে ২ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
অন্যদিকে একই সময়ে ফল আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অর্থাৎ রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা।
শুল্ক–কর বৃদ্ধির পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধিও ফলের দাম বাড়ার একটি কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের দাম ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বেশি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ভারতে আপেলের কেজি ছিল ১৫০ থেকে ২২০ টাকা, পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ টাকা এবং নেপালে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা।
অথচ বাংলাদেশে একই সময়ে আপেল বিক্রি হয়েছে ৩৮০ থেকে ৪৮০ টাকা কেজি দরে।
পুষ্টিবিদদের মতে, ফল মানুষের জন্য বিলাসপণ্য নয়, বরং প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল গড়ে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রাম।
পুষ্টিবিদ অধ্যাপক এস কে রায় জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান গ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্যারিফ কমিশন তাদের প্রতিবেদনে তাজা ফলের ওপর শুল্ক–কর কমানোর সুপারিশ করেছে।
সংস্থাটির যুক্তি, আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি ও আনারের পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন দেশে নেই। এসব ফলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
তাই এগুলোকে বিলাসপণ্যের মতো উচ্চ শুল্ক–করের আওতায় রাখলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং বৈধ আমদানিও বাধাগ্রস্ত হয়।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানও ফলের শুল্ক–কর কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ফলের শুল্ক–কর কমানোর বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে।
তবে কবে নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে, তা তিনি জানাননি।