আরএনবি অনলাইন ডেস্কঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন। দুনিয়ায় মানুষের কৃত কর্মের হিসাব নেওয়ার পর কাউকে জান্নাতে, কাউকে জাহান্নামে প্রেরণ করবেন। এটি আল্লাহ তাআলার এক অবশ্যম্ভাবী প্রতিশ্রুতি। তিনি যেমন সর্বশক্তিমান, তেমনি তাঁর পক্ষে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্পূর্ণ সহজ।
কুরআন কারীমে বহু স্থানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন—মৃত্যুর পর পুনরায় জীবন দান তিনি অবশ্যই করবেন। কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমান নেই, তারা আখিরাত ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে। তাদের এই সংশয় ও অবিশ্বাসের কথাও কুরআনে এসেছে এবং আল্লাহ তাআলা যুক্তি, প্রমাণ ও নিদর্শনের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছেন। কুরআনের ঘোষণা: পুনরুত্থান অনিবার্যসূরা ইয়াসিনের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা বলেন— “সে বলে, কে এই অস্থিগুলোকে জীবিত করবে, যখন এগুলো পচে গলে গেছে? বলে দাও, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন, তিনিই এগুলোকে আবার জীবিত করবেন। তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।”
(সূরা ইয়াসিন: ৭৮–৭৯)
এর পরপরই আল্লাহ বলেন—“যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি তাদের অনুরূপ আবার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? অবশ্যই সক্ষম। তিনি তো মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন—‘হয়ে যাও’, আর তা হয়ে যায়।”
(সূরা ইয়াসিন: ৮০–৮১)সূরা কিয়ামায় আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— “মানুষ কি মনে করে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? কেন নয়! আমি তো তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে সক্ষম।”
(সূরা কিয়ামাহ: ৩–৪) এ থেকে স্পষ্ট যে, আখিরাতে আল্লাহ তাআলা ঠিক সেই মানুষটিকেই পুনরায় জীবিত করবেন, যে দুনিয়ায় ছিল—একই দেহ, একই পরিচয় নিয়ে।
ইবরাহীম (আ.) ও চার পাখির ঘটনা মুমিনদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করার জন্য আল্লাহ তাআলা ইতিহাসে কয়েকবার মৃত্যুর পর জীবন দান করে তা প্রত্যক্ষভাবে দেখিয়েছেন। এর একটি বিখ্যাত ঘটনা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের। একদিন ইবরাহীম (আ.) আল্লাহ তাআলাকে বললেন, “হে আমার রব! আপনি মৃতকে কীভাবে জীবিত করেন, আমাকে তা দেখান।” আল্লাহ বললেন,“তুমি কি বিশ্বাস কর না?” তিনি বললেন, “বিশ্বাস করি, তবে অন্তরের প্রশান্তির জন্য দেখতে চাই।” তখন আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন—চারটি পাখি ধরতে, সেগুলো জবাই করে বিভিন্ন পাহাড়ে ভাগ করে রাখতে, তারপর ডাক দিতে। আল্লাহর কুদরতে সব পাখি জীবিত হয়ে তাঁর কাছে ফিরে এলো।
কুরআনে ঘটনাটি এসেছে—“আমি তোমাকে মানুষের জন্য নিদর্শন বানাতে চাই।”
(সূরা বাকারা: ২৬০) মানুষের পক্ষে যেখানে অঙ্গ আলাদা করা অসম্ভব, সেখানে আল্লাহ প্রত্যেক পাখিকে তার নিজস্ব অঙ্গসহ পুনরায় জীবিত করলেন। এক শত বছর মৃত থাকার পর পুনর্জীবন কুরআনে আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনার কথা এসেছে—এক ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। নগরী ধুলোয় মিশে গেছে দেখে তিনি বিস্ময়ে বললেন,
“আল্লাহ এই জনপদকে কীভাবে আবার জীবিত করবেন?” আল্লাহ তাআলা তাঁকে এক শত বছর মৃত্যু দান করলেন। এরপর পুনরায় জীবিত করে জিজ্ঞেস করলেন— “তুমি কতদিন ছিলে?” তিনি বললেন,
“এক দিন বা এক দিনের কিছু অংশ।”আল্লাহ বললেন—“না, তুমি এক শত বছর ছিলে। তোমার খাবার দেখো—পচেনি। আর তোমার গাধা দেখো—সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন। এখন দেখো, আমি কীভাবে একে জীবিত করি।” এরপর আল্লাহ তাঁর গাধাকে পুনরায় জীবিত করলেন। তখন ওই ব্যক্তি বলে উঠলেন—,“আমি জানি, আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
(সূরা বাকারা: ২৫৯)এই ঘটনাকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য নিদর্শন বানিয়েছেন। হাজারো মানুষকে একসঙ্গে জীবিত করা সূরা বাকারার ২৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—একদল মানুষ মৃত্যুভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। তারা সংখ্যায় ছিল হাজার-হাজার। কিন্তু আল্লাহ তাদের সবাইকে মৃত্যু দিলেন, এরপর আবার জীবিত করলেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞ নয়।”
(সূরা বাকারা: ২৪৩) ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বনি ইসরাঈলের একটি ঘটনা, যেখানে পরে আল্লাহর আদেশে একজন নবী তাদের পুনর্জীবনের জন্য দুআ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসএক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন— “মানুষ আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে—যখন সে বলে, আমি তাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে পারব না। অথচ প্রথমবার সৃষ্টি করা আরও কঠিন ছিল।”
(সহিহ বুখারি) মৃত্যুর পর পুনরুত্থান আল্লাহ তাআলার জন্য বিন্দুমাত্র কঠিন নয়। কুরআন, হাদিস, ইতিহাস ও প্রকৃতির প্রতিটি পুনর্জীবন—সবই এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। সবুজ গাছপালা, উর্বর জমিন যেভাবে বারবার মৃতপ্রায় হয়ে আবার জীবিত হয়, তা ঈমানের জন্য যথেষ্ট নিদর্শন। কিন্তু যার অন্তর জেদে অন্ধ, সে চোখের সামনে মৃত জীবিত হলেও ঈমান আনবে না। আর যারা সন্দেহ নিয়ে আখিরাতে উঠবে—তাদের জন্য তখন আর সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পরকালের এই অবশ্যম্ভাবী সত্য উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মাওলানা ফজলুদ্দীন মিকদাদ